বলতে পারেন একজন ফ্রিল্যান্সারের সবচেয়ে বড় নাইটমেয়ার কোনটা? আমি ই বলে দেই। সেটা হলো ক্লায়েন্ট হারিয়ে ফেলা। একজন ফ্রিল্যান্সার এই ক্যারিয়ার ফিল্ডে নতুন বা পুরাতন যেমনই হয়ে থাকুন না কেন, ক্লায়েন্ট হারিয়ে ফেলার ভয় কিন্তু সবার মনেই কম বেশি কাজ করে। আবার অনেক সময় এমন হয় যে ফ্রিল্যান্সাররা একের পর এক ক্লায়েন্ট হারিয়ে ফেলতে থাকেন ঠিকই, কিন্তু তারা এটার পেছনের কারণ খুঁজে বের করতে পারেন না। আজকের লেখায় আমি সবার সাথে শেয়ার করবো  ঠিক কোন কোন কারণে একজন ফ্রিল্যান্সার ক্লায়েন্ট হারিয়ে ফেলতে পারেন এবং কি করা হলে এই প্রবলেমটা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব সে সম্পর্কে।

একজন ফ্রিল্যান্সার কেন ক্লায়েন্ট হারিয়ে থাকেন?

যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে সবার আগে সে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করতে হয়। এ কারণেই লেখার শুরুতে আমি সবাইকে জানাবো যে ঠিক কোন কোন কারণগুলো একজন ফ্রিল্যান্সারের ক্লায়েন্ট হারিয়ে ফেলার পেছনে দায়ী।

১। আমার মতে ফলস কমিটমেন্ট দেয়া ফ্রিল্যান্সারদের ক্লায়েন্ট হারানোর সবচাইতে বড় কারণগুলোর একটা। স্বাভাবিকভাবেই একজন ফ্রিল্যান্সার তার নিজের স্কিল ও অ্যাবিলিটি সম্পর্কে সবচাইতে বেশি আইডিয়া রাখেন। তিনি জানেন যে তিনি তার ক্লায়েন্টদেরকে কোন লেভেলের বা কতটুকু সার্ভিস প্রোভাইড করতে ক্যাপাবল। এখন তিনি যতটুকু সার্ভিস প্রোভাইড করতে ক্যাপাবল তার চাইতে বেশি কমিটমেন্ট যদি ক্লায়েন্টদেরকে দিয়ে থাকেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই যে সার্ভিস তিনি ক্লায়েন্টদেরকে দেবেন সেটা আপ টু দ্যা মার্ক হবেনা। যার ফলে তখন ক্লায়েন্টও আর ওই ফ্রিল্যান্সারের সাথে কাজ করতে ইন্টারেস্টেড হবেননা।

২। ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটিতে এমন অনেক ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন যারা একই সাথে অনেক জন ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করে থাকেন। এর ফলে দেখা যায় অনেক সময়ই তারা সব ক্লায়েন্টকে সমান কোয়ালিটির সার্ভিস দিতে পারেন না। যার ফলে তারা ক্লায়েন্ট হারিয়ে ফেলেন।

৩। শুধু যে একজন ফ্রিল্যান্সারের সার্ভিস প্রোভাইড করা জনিত সমস্যার কারণে তিনি ক্লায়েন্ট হারিয়ে থাকেন ব্যাপারটা এমন নয়। অনেক সময় একজন ক্লায়েন্ট ও ফ্রিল্যান্সারের পার্সোনালিটি ম্যাচ করে না। এর ফলে তারা ইফেক্টিভলি একজন আরেকজনের সাথে কমিউনিকেট করতে পারেন না। তখন ঐ ক্লায়েন্ট মনে করেন যে অন্য কোনো ফ্রিল্যান্সার হয়তো তাকে বেটার সার্ভিস প্রোভাইড করতে পারবেন। তখন তিনি অন্য কাউকে হায়ার করেন। এর ফলেও কিন্তু একজন ফ্রিল্যান্সার ক্লায়েন্ট হারান।

৪। আমরা সবাই জানি যখন একজন ফ্রিল্যান্সার তার স্কিল এবং এক্সপেরিয়েন্স দুটোই বাড়াতে সক্ষম হন, তখন তিনি সেই অনুসারে তার পেমেন্ট রেট বাড়িয়ে থাকেন। অনেক সময় এমন হয় যে সেই ফ্রিল্যান্সারের বাড়িয়ে দেয়া পেমেন্ট রেট তার প্রেজেন্ট ক্লায়েন্টদের পছন্দ হয় না বা তারা সেই রেট অ্যাফোর্ড করতে পারেননা, তখন সেসব ক্লায়েন্ট আর ওই ফ্রিল্যান্সারের সাথে কাজ করতে চান না।

৫। অনেক সময় এমন হয় যে একজন ফ্রিল্যান্সার হয়তো কোনো ক্লায়েন্ট এর আন্ডারে কাজ করছেন, কিন্তু হঠাৎ করে সে ক্লায়েন্ট তার ব্যক্তিগত কোনো কারণে সার্ভিস নেয়া বন্ধ করে দেন। অথবা ঐ ক্লায়েন্ট যে কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন সে কোম্পানি থেকে শিফট করে অন্য কোম্পানির অন্য একটা টিমে জয়েন করেন। তখন সে ক্লায়েন্ট আগে যে ফ্রিল্যান্সারের সাথে রেগুলার বেসিসে কাজ করতেন, তার সাথে আর কাজ করতে পারেন না। যার ফলে ওই ফ্রিল্যান্সার ক্লায়েন্ট হারান।

মেইনলি এসব কারণেই একজন ফ্রিল্যান্সার তার ক্যারিয়ারে ক্লায়েন্ট হারানোর এক্সপেরিয়েন্স করে থাকেন।

 

ক্লায়েন্ট হারানোর এমন সিচুয়েশনে কি করা যেতে পারে?

অনেকে মনে করেন শুধুমাত্র যেসব ফ্রিল্যান্সার নতুন ক্যারিয়ার শুরু করছেন, তারাই হয়তো ক্লায়েন্ট হারিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ব্যাপারটা মোটেও সত্য নয়। আমি এমন অনেক ফ্রিল্যান্সারকে দেখেছি যারা তাদের ক্যারিয়ারের পিক পয়েন্টে আসার পরেও বিভিন্ন কারণে ক্লায়েন্ট হারিয়েছেন।

সত্যি বলতে একটু ঠান্ডা মাথায় ও স্ট্র্যাটেজিক উপায় কাজ করলে ক্লায়েন্ট হারানোর এ সমস্যাটা খুব ইজিলি ডিল করা যায়। তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক একজন ফ্রিল্যান্সার যখন ক্লায়েন্ট হারানোর সমস্যাটা ফেস করেন, তখন তিনি কীভাবে এ সিচুয়েশনটা হ্যান্ডেল করতে পারেন।

একজন ফ্রিল্যান্সার ক্লায়েন্ট হারাতে শুরু করলে তাকে সাজেশন হিসেবে আমি সবার আগে বলবো মাথা ঠান্ডা রাখার জন্য। আমি জানি যখন একজন ফ্রিল্যান্সার ক্লায়েন্ট হারিয়ে ফেলতে শুরু করেন, সেটা মোটেও কোন ভালো লাগার মতো বিষয় নয়। তবে এমন সিচুয়েশনে যদি প্যানিক করেন তাহলে কিন্তু হিতে বিপরীত হবে। অনেকেই রয়েছেন যারা প্যানিক করার পাশাপাশি যেসব ক্লায়েন্টকে হারিয়ে ফেলেছেন তাদেরকে ব্লেইম করা শুরু করেন, যেটা মোটেও উচিত নয়।

বরং সব সময় মাথায় রাখতে হবে ক্লায়েন্ট হারিয়ে ফেলা ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারেরই একটা পার্ট। তাই যদি কখনো এই সিচুয়েশনে মুখোমুখি হয়ে থাকেন, তাহলে যথাসম্ভব মাথা ঠাণ্ডা রাখুন এবং প্যানিক না করে চিন্তা করতে থাকুন  নিজের কাছে কতটুকু সেভিংস রয়েছে এবং এই সেভিংস দিয়ে কতদিন ঠিকমতো চলতে পারবেন। সাধারণত বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকে এবং তারা তাদের একাউন্টে সবসময় ফিউচারের জন্য কিছু টাকা সেভ করার ট্রাই করে থাকেন।

যখন ক্লায়েন্টের সংখ্যা কমে যেতে শুরু করবে, তখন কিন্তু এই সেভ করা টাকাটাই কাজে আসে। তাই মনে মনে হিসাব করে ফেলুন যে পরিমাণ টাকা সেভ করে রেখেছেন, সেই টাকা দিয়ে কতদিন চলতে পারবেন এবং কিভাবে চললে কম টাকা খরচ করে হলেও ভালোমতো চলা পসিবল হবে। মনে রাখবেন এই সিচুয়েশনটা কিন্তু সারাজীবন থাকবে না। তাই সাময়িক এই সিচুয়েশনে মিতব্যয়ী হওয়ার ট্রাই করুন।

এরপর কি করতে হবে জানেন? নতুন ক্লায়েন্ট খোঁজার জন্য নিজেকে মেন্টালি প্রিপেয়ার করতে হবে। এ সময়টায় কোন রকম নেগেটিভ চিন্তা নিজের মাথায় আনা যাবেনা। বরং সব সময় পজিটিভ থাকতে হবে।

যেহেতু ক্লায়েন্টের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে একজন ফ্রিল্যান্সারের হাতে এ সময় কিছুটা ফ্রি টাইম থাকে, তাই এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নিজের স্কিলটাকেও আরেকটু ঝালাই করে নিতে পারেন। কারণ ফ্রিল্যান্সিং এমন একটা ক্যারিয়ার ফিল্ড যেখানে যার স্কিল যত বেশি তার এগিয়ে থাকার চান্সও ততবেশি!

এখন নতুন করে ক্লায়েন্ট খোঁজার জন্য কি করতে পারেন? নতুন করে ক্লায়েন্ট জেনারেট করার জন্য পুরাতন ক্লায়েন্টদের রেফারেল দারুন হেল্প করে। তাই আপনার যদি এমন কোনো ক্লায়েন্ট থাকে যার সাথে আপনার কমিউনিকেশন অনেক ভালো, তাহলে তার কাছ থেকে রেফারেল রিকোয়েস্ট করতে পারেন। তবে কখনই কোনো ক্লায়েন্টকে রেফারেল এর জন্য জোর করতে যাবেন না।

এছাড়া যদি মার্কেটপ্লেসের বাইরে কাজ করে থাকেন, তাহলে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা লিঙ্কডইনের মত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে কাজে লাগিয়ে ক্লায়েন্ট জেনারেট করার ট্রাই করতে পারেন। এছাড়াও ক্লায়েন্ট জেনারেশন করার জন্য কোল্ড ইমেইল কিন্তু বরাবরই দারুন ইফেক্টিভ। আর এই নতুন ক্লায়েন্ট খুঁজতে গিয়ে যদি কোনো প্রবলেম ফেইস করেন, তাহলে এক্সপার্ট দের কাছ থেকে হেল্প চান। দেখবেন ধীরে ধীরে আবার ক্লায়েন্ট জেনারেট করতে পারবেন।

যখন ধীরে ধীরে নতুন ক্লায়েন্ট পাওয়া শুরু করবেন, তখন তাদের সাথে প্রোপারলি কমিউনিকেট করুন এবং তাদের ডিমান্ড বুঝে সে অনুযায়ী যতটুকু সম্ভব হাই কোয়ালিটির সার্ভিস প্রোভাইড করুন। টার্গেট রাখুন  নতুন করে যে ক্লায়েন্টদের সাথে কাজ করা স্টার্ট করবেন তাদেরকে আইডিয়াল ক্লায়েন্টে কনভার্ট করতে।

লেখার শেষে সবার জন্য এটুকুই বলতে চাই এই ক্লায়েন্ট হারিয়ে ফেলার সিচুয়েশনটা একজন ফ্রিল্যান্সারের জন্য যথেষ্ট মেন্টাল স্ট্রেস বয়ে আনলেও এই ফেইজটা একদমই সাময়িক। তাই নিজের স্কিলের ওপর ভরসা রেখে নতুন ক্লায়েন্ট জেনারেট করার জন্য কাজ করে যান দেখবেন অবশ্যই এই সিচুয়েশন থেকে উদ্ধার পেতে পারবেন।

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

Leave a Comment