“বার্ন আউট” 

এ শব্দটা শুনতে কিছুটা অপরিচিত মনে হলেও আমি শিওর প্রত্যেক ফ্রিল্যান্সার তার ক্যারিয়ারের কোনো না কোনো পর্যায়ে এ সিচুয়েশনের মুখোমুখি হয়েছেন। 

কি? বুঝতে প্রবলেম হচ্ছে? আরেকটু ডিটেইল এক্সপ্লেইন করি! আমরা সবাই জানি যে ফ্রিল্যান্সিং ফিল্ডে কাজ করলে সেখানে কাজের চাপ অন্যান্য ফিল্ডের চাইতে অনেক বেশি থাকে। কারণ এই ফিল্ডে একজন ফ্রিল্যান্সারকে একই সাথে অনেকজন ক্লায়েন্টেকে সার্ভিস দিতে হয়। আবার একেকজন ক্লায়েন্টের সার্ভিসের ধরণও একেক রকম হয়। এভাবে মাথায় প্রেশার নিয়ে কাজ করতে করতে একজন ফ্রিল্যান্সার মাঝেমধ্যেই ফিজিক্যালি ও মেন্টালি প্রচন্ড টায়ার্ড ফিল করেন। তখন তিনি আর আগের স্পিডে কাজ করতে পারেন না এবং তার মনে হতে থাকে যে সব কাজ ফেলে একটু বিশ্রাম নেয়া প্রয়োজন। এই সিচুয়েশনটাকেই ফ্রিল্যান্স বার্ন আউট বলা হয়। 

ফ্রিল্যান্সাররা বার্ন আউট ফেস করলে সেটা যে শুধুমাত্র তাদের প্রোডাক্টিভিটি অর্থাৎ ক্লায়েন্টকে সার্ভিস দেয়ার কাজে ব্যাঘাত ঘটায় না নয়, বরং এর ফলে একজন ফ্রিল্যান্সার তার পার্সোনাল লাইফেও বিভিন্ন প্রবলেম ফেস করেন।

যেমনঃ অসুস্থ হয়ে যান, ক্লান্ত থাকার কারণে বিভিন্ন ফ্যামিলি ইভেন্ট অ্যাটেন্ড করতে পারেননা, নিজের পরিবারকে ঠিকমতো সময় দিতে পারেন না এবং নিজের খেয়ালও সঠিকভাবে রাখতে পারেন না। তাই বলা যেতে পারে ফ্রিল্যান্স বার্ন আউট একজন ফ্রিল্যান্সারের পার্সোনাল ও প্রোফেশনাল লাইফ- দুটোর ক্ষেত্রেই বেশ ক্ষতিকর। 

তাই আজকের লেখায় আমি সবার জন্য শেয়ার করবো  একজন ফ্রিল্যান্সার যখন বার্ন আউট ফেস করেন, তখন তিনি কিভাবে সেই সিচুয়েশনটাকে ট্যাকেল দিতে পারবেন এবং নিজের প্রোডাক্টিভিটি বুস্ট করে প্রোফেশনাল ও পার্সোনাল লাইফ ব্যালেন্স করতে পারবেন সে সম্পর্কে। 

ফ্রিল্যান্স বার্ন আউট কেন হয়?

চলুন লেখার শুরুতেই ফ্রিল্যান্স বার্ন আউট কেন হয়। তা জেনে নেয়া যাক। এক্সপার্টদের মতে, প্রতিটা ক্যারিয়ার ফিল্ডের এমপ্লয়িদের বেশিরভাগই বার্ন আউট ফেস করে থাকেন। তবে ফ্রিল্যান্সাররা একটু বেশিই প্রবলেমটার ভিক্টিম হন। কেন জানেন? কারণ ফ্রিল্যান্সিংয়ে অন্যান্য জবের মতো নির্দিষ্ট কোনো টাইম টেবিল থাকে না। ফলে একজন ফ্রিল্যান্সার যেমন সকাল নয়টায় কাজ করতে পারেন, তেমনি রাত চারটায়ও কাজ করতে পারেন। 

অনেক সময় দেখা যায় একজন ফ্রিল্যান্সার যতোটুকু কাজের প্রেশার নিতে ক্যাপাবল, তার থেকে অনেক বেশি প্রেশার নিয়ে ক্লায়েন্টদেরকে সার্ভিস প্রোভাইড করতে থাকেন। আর সবাই তো জানেন ই, যখন কাজের চাপ অনেক বেশি থাকে, তখন নিজের খেয়াল রাখার সময় থাকেনা। একারণেই যখন একজন ফ্রিল্যান্সার অনেক বেশি কাজ করতে থাকেন, তখন তিনি একসময় বার্ন আউট ফেস করেন। 

ফ্রিল্যান্স বার্ন আউট ফেস করার মূল প্রবলেমটা হচ্ছে এর ফলে ফিজিকাল ও মেন্টাল টায়ার্ডনেস দেখা যায় বলে কাজের প্রোডাক্টিভিটি অনেক কমে যায়। তখন ক্লায়েন্টদেরকে সার্ভিস দেয়ার ইচ্ছা কমে গিয়ে নিজের কাজের প্রতি নেগেটিভিটি ও ডিমোটিভেশন গ্রো করে। এর ফলে সার্ভিস দেয়ার সময়ও আগের মত কোয়ালিটি মেইনটেইন করা পসিবল হয় না। আবার টাইম ম্যানেজমেন্ট করতেও প্রবলেম হয়। এর ফলে একজন ফ্রিল্যান্সারের ক্লায়েন্ট হারিয়ে ফেলার চান্সও অনেক বেশি থাকে। এসব কারণেই ফ্রিল্যান্স বার্ন  দেখা দিলে সেটা সলভ করা খুব বেশি ইম্পরট্যান্ট।

বার্ন আউট ফেস করলে কি করবেন?

যখন একজন ফ্রিল্যান্সার বার্ন আউট ফেস করা শুরু করেন, তখন সবার আগে তার কি করা উচিত জানেন? কাজ থেকে একটা ছোট্ট ব্রেক নেয়া! যেহেতু এসময় কাজ করতে একেবারেই ইচ্ছা করে না, তাই যদি মনের বিরুদ্ধে যে কাজ করেন তাহলে কিন্তু কোন উপকার হবে না। বরং কাজের প্রতি ডিমোটিভেশন আরো বেড়ে যাবে। 

একারণে কাজ থেকে ছোট্ট একটা ব্রেক নিন।  ব্রেক নিয়ে কাছাকাছি কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন, নিজের ফ্যামিলির সাথে টাইম স্পেন্ড করতে পারেন  আবার যদি নিজের কোনো পছন্দের কাজ থাকে, যেমনঃ বই পড়া কিংবা মুভি দেখা সেগুলোও করতে পারেন। মোটকথা কিছু সময় কাজ থেকে একেবারেই দূরে থাকতে হবে। দেখবেন এটা অনেক বেশি হেল্পফুল হবে। 

ব্রেক নেয়ার পর যখন আবার ক্লায়েন্টদেরকে সার্ভিস দেওয়া স্টার্ট করবেন, তখন সবার আগে নিজের পার্সোনাল লাইফ ও প্রোফেশনাল লাইফে কিভাবে একটা ব্যালেন্স মেইনটেইন করা যায় সেটার প্ল্যান সেট করে ফেলুন৷ 

সব সময় মনে রাখবেন কখনোই নিজের ক্যাপাবিলিটির বাইরে যেয়ে কাজের প্রেশার নেয়া যাবে না। যদি কোনো ক্লায়েন্টের ডিমান্ড এমন হয় যেটা আপনার ক্যাপাবিলিটি বাইরে, তাহলে ক্লায়েন্টকে সরাসরি না বলুন৷ এমন কোনো সার্ভিস প্রোভাইড করবেন না যেটা মেন্টাল প্রেশার ক্রিয়েট করতে পারে। 

আবার একই সাথে এটাও মাথায় রাখুন, ফ্রিল্যান্সিং করছেন বলেই যে দিনের ২৪ ঘন্টা কাজের পেছনে  দিতে হবে ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। সবচেয়ে ভালো হয় যদি পুরো দিনের একটা রুটিন সেট করে ফেলতে পারেন। এই রুটিনে কখন কোন ক্লায়েন্টের কাজ করবেন সেটা ইনক্লুড করার পাশাপাশি নিজের খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম কিংবা এক্সারসাইজ দিনের কখন করবেন এবং কতক্ষণ সময় ধরে করবেন সেটাও ইনক্লুড করুন।  

আমি নিজে ফ্রিল্যান্সিং ফিল্ডে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি।  নিজের এতদিনের এক্সপেরিয়েন্সের ওপর ভিত্তি করে সবাইকে সাজেস্ট করবো কখনোই নিজের খাওয়া-দাওয়া ও ঘুম কোনো কিছুর বিনিময় বিসর্জন দিতে যাবেন না৷ 

কারণ যদি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করেন এবং প্র‍য়োজনমতো না ঘুমান, তাহলে যেমন কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন না, তেমনি একইসাথে দেখতে পাবেন মাথাব্যথা, ব্যাকপেইন, চোখে ব্যথা ইত্যাদি বিভিন্ন ফিজিক্যাল প্রবলেম দেখা দিচ্ছে। তাই নিজেকে অবশ্যই প্রায়োরিটি দিতে হবে। 

নিজের ডেইলি রুটিনের কিছুটা সময় ফ্যামিলির জন্য রাখুন। যখন নিয়মিত ফ্যামিলির সাথে কিছুটা কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করতে পারবেন, তখন দেখতে পাবেন কাজের প্রতি যে টায়ার্ডনেস আগে কাজ করতো সেটা ধীরে ধীরে কমে যেতে শুরু করেছে। 

অনেক সময় এমন হতে পারে যে একজন ফ্রিল্যান্সার যে পরিমাণ পেমেন্ট তার ক্লায়েন্টের কাছ থেকে ডিজার্ভ করেন সেটা না পাওয়ার কারণে তিনি বার্ন আউটের শিকার হন। যদি এমন হয় তাহলে আমার পরামর্শ থাকবে নিজের প্রাইসিং কিছুটা বাড়ানোর জন্য। 

কারণ যদি নিজের স্কিল ও এক্সপার্টাইজ অনুযায়ী ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পেমেন্ট না পান, সেটা নিজের মধ্যে হতাশা ক্রিয়েট করে এবং এখান থেকেই ধীরে ধীরে কাজের প্রতি নেগেটিভিটি জন্মায়। তাই যদি নিজেকে নিয়ে কনফিডেন্ট হয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই প্রাইসিং বাড়াতে পারেন। কারণ যেসব ক্লায়েন্ট আপনার ভ্যালু বুঝবে তারা আল্টিমেটলি ঠিকই আপনার কাছ থেকেই সার্ভিস নেবে। 

আবার কিছু কিছু কেইসে দেখা যায় অনেকদিন ট্রাই করার পরেও ক্লায়েন্ট না পাওয়ায় অনেকে ফ্রিল্যান্স বার্ন আউট ফেস করেন ও ডিমোটিভেটেড হয়ে যান। তাই এবার আসা যাক কিভাবে নিজের প্রোডাক্টিভিটি মোটিভেশন বুস্ট করা যায় সে সম্পর্কে। নিজেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রতি আবার মোটিভেটেড করে তোলার জন্য প্রোপারলি নিজের সার্ভিসের মার্কেটিং করা বেশ হেল্প ফুল। তাই কিভাবে নিজের সার্ভিসের মার্কেটিং করা হলে সেটা সবচেয়ে বেশি ইফেক্টিভ হতে পারে তা সম্পর্কে প্রোপারলি রিসার্চ করে নিন।

বর্তমানে নিজের সার্ভিসের মার্কেটিং করার জন্য বিভিন্ন মাধ্যম রয়েছে। যেমনঃ ওয়েবসাইট, কোল্ড ইমেইল, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ইত্যাদি। নিজের সার্ভিস গুলোকে ক্লায়েন্টদের সামনে প্রোপারলি প্রেজেন্ট করার জন্য ওয়েবসাইট খুবই কার্যকরী। আবার যদি নতুন ক্লায়েন্টকে আইডিয়াল ক্লায়েন্টে কনভার্ট করতে চান, তাহলে কোল্ড ইমেইল খুব ভালো কাজে আসে।  অন্যদিকে যদি চান সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ক্লায়েন্ট জেনারেট করতে, তাহলে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার হেল্প নিতে পারেন। 

ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং  লিংকডইন এই তিনটা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ক্লায়েন্ট জেনারেট করতে খুবই ইফেক্টিভ। এগুলোর পাশাপাশি ট্রাই করুন পুরাতন ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে কিছু টেস্টিমনিয়াল কালেক্ট করতে। কারণ নতুন ক্লায়েন্ট পাওয়ার জন্য ক্লায়েন্ট টেস্টিমনিয়াল ম্যাজিকের মতো কাজে আসে৷ সুতরাং যদি ক্লায়েন্ট না পাওয়ার ফলে ফ্রিল্যান্স বার্ন আউট ফেইস করেন, তাহলে নিজের সার্ভিসের মার্কেটিংয়ে মনোযোগ দিন। দেখবেন একটা বেটার আউটপুট পাবেন। 

এটুকুই ছিল আমাদের আজকের ডিসকাশন। আশা করি সবাই বুঝতে পেরেছেন ফ্রিল্যান্স বার্ন আউটের সিচুয়েশনটা কিভাবে ইফেকটিভলি হ্যান্ডেল করা যেতে পারে। সবার জন্যে অনেক শুভকামনা রইলো। 

 

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

Leave a Comment